দৈনন্দিন জীবনে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা

দৈনন্দিন জীবনে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা

Information Science

জাগতিক প্রায় সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা । প্রতিটি বস্তুই অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি । এদের কাজকর্মের বেশির ভাগই অবশ্য আমাদের দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায় । পরীক্ষা – নিরীক্ষা ও উপলব্ধির মাধ্যমে তাদের কার্যকলাপ বুঝতে হয় । তবে কিছু কিছু উদাহরণ আছে । যেগুলােয় বাস্তবে কোয়ান্টাম মেকানিকসের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায় ।

ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ

ডিজিটাল ক্যামেরা কিংবা মােবাইলের ক্যামেরা দিয়ে যে ছবিগুলাে তােলা হয় । সেই ছবি ওঠে দৃশ্যমান আলাের সাহায্যে । গড়পড়তাভাবে দৃশ্যমান আলাের তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আকার ৫০০ ন্যানােমিটার । মাঝেমধ্যে খুব সূক্ষ্ম জিনিসের ছবি তুলতে হয় । যেমন ক্ষুদ্র কোনাে কোষ বা কোষের নিউক্লিয়াস কিংবা ডিএনএর গঠন । একটি ডিএনএ অণুর প্রস্থ কয়েক ন্যানােমিটার মাত্র । আলাের তরঙ্গের আকার যেখানে কয়েক শ ন্যানােমিটার সেখানে আলাের মাধ্যমে কীভাবে কয়েক ন্যানােমিটারের ছবি তােলা যাবে ? এখানে দারুণ একটি সমাধান দিয়েছে । কোয়ান্টাম মেকানিকস । কীভাবে ? একসময় মনে করা হতাে আলাে আসলে তরঙ্গ । কিন্তু পরে দেখা যায় আলাের কণা বৈশিষ্ট্যও আছে । ইলেকট্রন আসলে কণা । কিন্তু পরে দেখা যায় ইলেকট্রনের মধ্যে তরঙ্গ বৈশিষ্ট্যও আছে । একই জিনিসের মধ্যে কণা ও তরঙ্গের উপস্থিতির এ ঘটনাকে বলা হয় কণা – তরঙ্গ দ্বৈততা । ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্মকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা একে ছবি তােলার কাজে লাগিয়ে ফেললেন ।

এমআরআই স্ক্যানার

দেহের অভ্যন্তরের খোজ জানতে হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের । স্বাভাবিক ক্যামেরায় সেসব কাজ করা যায় না তেমন একটা । এ ক্ষেত্রে এক্স – রে বা আলট্রাসনােগ্রাফি ভালাে কাজে দেয় । এক্স – রের মাধ্যমে ভেদযােগ্য নমনীয় মাংস পেরিয়ে ভেতরের দৃঢ় অস্থি বা টিউমারের ছবি তােলা যায় । কিছু কিছু ছবি এক্স – রের মাধ্যমে তােলা যায় না । যেমন গর্ভে থাকা ভ্রণের ছবি । এ ক্ষেত্রে আলট্রাসনােগ্রাফি ব্যবহার করা হয় । একটি মেশিন থেকে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ পাঠানাে হয় দেহের ভেতর । সেসব শব্দতরঙ্গ শরীরের বিভিন্ন স্তরে প্রতিফলিত হয় , ত্বক ও তরল অংশের মধ্যে , তরল অংশ ও মাংসপেশির মধ্যে , মাংসপেশি ও অস্থির মধ্যে । সেই প্রতিফলিত শব্দ ধারণ করা হয় আরেকটি যন্ত্রে । সেসব শব্দের ধরন এবং প্রতিফলনের ব্যাপ্তির সময় বিশ্লেষণ করে একটি দ্বিমাত্রিক ছবি তৈরি করে যন্ত্রটি । সেটা দেখে বলে দেওয়া যায় দেহের ভেতরের খবর । তবে মানুষের প্রয়ােজন আরও বেশি । অস্থির ভেতরের খবরও মানুষের দরকার । কলার ( টিস্যু ) পুঙ্খানুপুঙ্খ ছবিও দরকার । এই কাজগুলাে করে দিতে পারে এমআরআই স্ক্যানার । আর এই স্ক্যানারের মূল ভিত্তিই হচ্ছে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা । কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলাে স্পিন । এ মেশিনে কণার স্পিন ধর্মটিকেই কাজে লাগানাে হয় । স্পিন কী ? একটি ফুটবলকে যদি ঘূর্ণনের সঙ্গে লাথি দেওয়া হয় তাহলে বলটি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এবং লাটিমের মতাে ঘুরবেও । মৌলিক কণাগুলাের মধ্যেও এ রকম ঘূর্ণন বৈশিষ্ট্য আছে একে বলা যেতে পারে কণার স্পিন । কোনােটির স্পিন ১ , কোনােটির ২ , আবার কোনােটির ১/২ কিংবা ৩। মানুষের দেহে কণাদের স্পিন বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগানাের প্রক্রিয়াটি বেশ মজার । মানুষের দেহের বেশির ভাগই পানি । পানির উপাদানে আছে হাইড্রোজেন । পানিতে হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াসে থাকে একটি প্রােটন । এর মানে হলাে একক প্রােটন । প্রােটনের মধ্যে স্পিন বৈশিষ্ট্য কাজ করে । প্রােটনের এই স্পিন আবার চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় । এমআরআই মেশিন দিয়ে শক্তিশালী একটি চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করা হয় ।

ফোটন একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গ । তাই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় এর আকার কেমন । যদি ফোটনকে তরঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহলে এর একটি তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের বিস্তার বা তরঙ্গের প্রস্থকে বলা যেতে পারে তরঙ্গের আকার । ভিন্ন ভিন্ন রঙের ফোটনের শক্তি ভিন্ন ভিন্ন হয় । ভিন্ন ভিন্ন শক্তির ফোটনের তরঙ্গের বিস্তার ভিন্ন ভিন্ন হয় । সেই হিসাবে নীল আলাের ফোটনের বিস্তার ৫০০ ন্যানােমিটার ।

চৌম্বকক্ষেত্রের তীব্রতার মান ০.২ টেসলা থেকে ৩ টেসলা পর্যন্ত হয় । একটি সাধারণ রেফ্রিজারেটরে যে পরিমাণ চৌম্বকক্ষেত্র থাকে তার প্রায় হাজার গুণ শক্তিশালী এই চৌম্বকক্ষেত্র ।

যখন দেহের হাইড্রোজেনের প্রােটনগুলাে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে পড়ে তখন । তাদের স্পিন উল্টে যায় । ঘড়ির কাটার দিকেরগুলাে বিপরীত দিকে চলে যায় , বিপরীত দিকেরগুলাে ঘড়ির কাটার দিকে চলে আসে । যখন যন্ত্র থেকে চৌম্বকক্ষেত্র বন্ধ করে ফেলা হয় তখন প্রােটনের ঘূর্ণন আগের অবস্থায় ফিরে আসে । অয়নচলন বা Precession নামে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ব্যাপারটি সম্পন্ন হয় । পরিবর্তিত অবস্থা থেকে যখন মূল অবস্থায় ফিরে আসে তখন প্রােটন থেকে রেডিও সিগন্যাল নির্গত হয় । এই সিগন্যাল আবার ধারণ করা হয় স্ক্যানারের রিসিভারে । ধারণ করা সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে ছবিতে রূপান্তর করে দেখায় আমাদের ।

দেহের ভিন্ন ভিন্ন অংশে , ভিন্ন ভিন্ন টিস্যুতে পানির ঘনত্ব আলাদা । তাই প্রােটনের ঘনতত্ত্ব আলাদা । এজন্য বিভিন্ন টিস্যুতে স্পিন পরিবর্তনের হারও আলাদা হয় । রক্তের ক্ষেত্রে যে হার , মাংসপেশির ক্ষেত্রে তেমন নয় । মাংসপেশির ক্ষেত্রে স্পিনের পরিবর্তনের হার যেমন , মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে হার তেমন নয় । মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে যেমন , অস্থির ক্ষেত্রে আবার তেমন নয় । তাই কোনাে অংশের স্পিন । পরিবর্তনের হার কেমন , তা বিশ্লেষণ করে বলে দেওয়া যায় এটি দেহের কোন অংশের টিস্যু । এভাবে মস্তিষ্কের ভেতরের রূপ কিংবা অস্থিমজ্জার কলকবজা সম্বন্ধেও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় । ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়ােগ করে দেহের অভ্যন্তরীণ গঠনের ত্রিমাত্রিক ছবিও পাওয়া যায় । আরও অসুস্থ হলে মানুষের দেহের কোন অংশে সুক্ষাতিসূক্ষ পরিবর্তনও এই রেডিও সিগন্যালে ধরা পড়ে । চিকিৎসকরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন ।

লেজার

লেজারের মূল ভিত্তি লুকিয়ে আছে কোয়ান্টাম বলবিদ্যারর ভেতর । এই ভিত্তি প্রদান

কোয়ান্টাম স্পিনকে বােঝানাের জন্য কখনাে কখনাে ঘূর্ণমান কোন বস্তু , যেমন ফুটবলের সঙ্গে তুলনা করা হয় । যদিও গাণিতিকভাবে পাওয়া এই ব্যাপারটা এভাবে কল্পনা করায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে । ফুটবল যদি নিজের অক্ষের ওপর একটি পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করে অর্থাৎ ৩৬০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে আসে তাহলে সেটি আবার আগের রূপে ফিরে আসবে । মৌলিক কণার ক্ষেত্রেও এ রকম হয় । একটি পূর্ণ চক্রে যদি আগের রূপে ফিরে আসে তাহলে তার স্পিন ১। তবে ভিন্ন রকমও হতে পারে । কোনাে কোনাে কণা আছে অর্ধেক চক্র সম্পন্ন করলেই অর্থাৎ ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরলেই আগের রূপে ফিরে আসে । এ ধরনের কণার স্পিন ২। আবার কোনাে কোনাে কণার ক্ষেত্রে আগের রূ পে ফিরে আসতে দুই দুটি পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করতে হয় বা ৭২০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে আসতে হয় । এ ধরনের কণার স্পিন ১/২ ।

করেছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন । ১৯১৭ সালের দিকে | তিনি আমােক নিঃসরণ নিয়ে একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন । তিনি বলেছিলেন , যদি কোনাে পরমাণুতে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রদান করা হয় তাহলে সেটি উদ্দীপিত হয়ে ফোটন নিঃসরণ করবে । নিজে তাে করবেই পাশাপাশি পাশের । পরমাণুকেও ফোটন নিঃসরণের জন্য উদ্দীপিত করবে । পাশের পরমাণুটি আবার তার পাশের পরমাণুকে উদ্দীপিত করবে । এভাবে একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকবে । এ প্রক্রিয়ায় নিঃসরিত সব ফোটন একই শক্তির হবে এবং একই দিকে ছুটবে । এ কারণেই লেজারের আলাে এক রঙের হয় এবং এক দিকে অনেক দূর পর্যন্ত যায় । কম্পিউটার ও স্মার্টফোন কম্পিউটার , স্মার্টফোন ও অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রায় সবগুলােতেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রয়ােগ আছে । যন্ত্রগুলাে তৈরির জন্য যে চিপ ব্যবহার করা হয় । সেগুলােতে অর্ধপরিবাহী , ক্রিস্টাল , ব্যান্ড স্ট্রাকচার ইত্যাদি অনেক নিয়মনীতির প্রয়ােগ থাকে । আর এসব নিয়মনীতি গড়ে উঠেছে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ওপর ভিত্তি করে । যতবারই আমরা ফোনে কথা বলি , যতবারই আমরা এলইডি ডিসপ্লেতে তাকাই ততবারই আসলে আমরা কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে ব্যবহার করে চলেছি । জগতের সবকিছুই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৌলিক কণিকার কণা দিয়ে তৈরি । ক্ষুদ্র কণা মানেই সেখানে আছে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার বিষয় । জগতে যা কিছু হচ্ছে কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে মেনেই হচ্ছে । বলা যায় আমরা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সাগরেই ডুবে আছি । হয়তাে তাদের অস্তিত্বের দেখতে পাচ্ছি না , কিন্তু তারা ঠিকই বিরাজ করছে । 

লেখক : শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ
সূত্র : লাইভ সাইন্স, আইওপি, ব্রায়ান কোবারলিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *